ছাত্রের হাতে শিক্ষকের মৃত্যু:
শনিবার (২৫ জুন) দুপুরে হাজী ইউনুস আলী কলেজ (স্কুল) এর পঞ্চম শ্রেণীর মেয়েদের আন্ত: শ্রেণী ক্রিকেট প্রতিযোগীতার প্রথম খেলাটি চলছিলো। খেলাটি পরিচালনার দ্বায়িত্বে ছিলেন বিদ্যালয়ের পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের শিক্ষক এবং শৃংখলা কমিটির সভাপতি উৎপল কুমার সরকার (৩৭)। মাঠের একপাশে দাড়িয়ে খেলাটি পরিচালনা করছিলেন উৎপল কুমার। মেয়েদের এই খেলাটি চার অভারের সময় এই বিদ্যালয়েরই দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম জিতু ওরুফে জিতু দাদা (১৭) অর্তকিতভাবে স্কুলের পোশাক বাদে সিভিলে বাহির থেকে একটি কাঠের স্ট্যাম্প নিয়ে এসে হামলা করে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের উপর। পেছন থেকে কয়েকটি আঘাত করার পর বাকি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর তাকে আটকাতে গেলে সামনের থেকে উপর্যপরি স্ট্যাম্প দিয়ে পেটে ও মাথায় আঘাত করে ছাত্র ভেষ ভোষন ধরা কিশোর গ্যাং লিডার জিতু দাদা।
এই ঘটনার পুরো দৃশ্যটি মাঠের আরেক পাশে থেকে দেখেছেন সেই বিদ্যালয়টির আরেক শিক্ষক সমাজ কল্যান বিষয়ের প্রভাষক সফিকুল ইসলাম। সোমবার (২৭ জুন) আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে গেলে প্রভাষক সফিকুল ইসলাম সেই নির্মম ঘটনাটির এভাবেই বর্ণনা দেন।
তিনি বলেন, ‘যখন ঘটনাটি ঘটে আমি তখন মাঠের আরেক পাশে ছিলাম। আমি দেখেছি, যেতে যেতেই স্যারকে কয়েকটি আঘাত করে ফেলে জিতু। আমি জিতুর প্রতি রাগানিত হয়ে তাকে মারার জন্য হাত তুললে জিতু বলে উঠে ‘মেরে দেখ’। পরে জিতুর সাথে কথা বাদ দিয়ে বাকি স্যারদের সাথে নিয়ে প্রথমে উৎপল স্যারকে নারী ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাই সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাভারের এনাম মেডিকেলে নিয়ে গেলে একদিনপর আজ উৎপল স্যার আইসিইউতে থাকা অবস্থায় মারা যান।’
আশরাফুল ইসলাম জিতুর বিষয়ে জানতে চাইলে সফিকুল ইসলাম জানান, জিতু এমনিতেই বখাটে স্বভাবের। সে ছাত্র হিসেবেও বেশি ভালো না। এছাড়া নিয়মিত স্কুলে আসতো না। ছাত্র হিসেবে খারাপ হলেও সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করতো। স্কুলে কাউকে পরুয়া করতো না। স্কুলের নিয়ম কানুনও মানতো না। এসব নিয়ে অনেকবার বিচার করেছে আমাদের স্কুল কর্তৃপক্ষ সেখানে প্রায় সব বিচারেই ছিলেন উৎপল কুমার সরকার। উৎপল কুমারসহ তারা অনেকভাবে জিতুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে জিতুর অভিভাবককেও বলেছে কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। বরংচ সেই থেকে আজ শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে জিতুর হাতে। স্কুল ঘটনার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সবাই একত্রিত হয়েছে জিতুকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত স্কুল বন্ধ থাকবে।
বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা গেছে, স্কুলটির নামই হাজী ইউনুস আলী কলেজ। কলেজ হলেও স্কুলের কার্যক্রমও চলে প্রতিষ্ঠানটিতে। লম্বা লম্বি ছোটো একটি মাঠ, মাঠের দুই পাশে দুটি সিসি টিভি ক্যামেরা রয়েছে ও পাশেই তিনতলা একটি ভবন রয়েছে সেখানেই শিক্ষা কার্যক্রম হয়। মাঠের পূর্ব পাশে সেই হামলার ঘটনায় রক্ত পড়ে থাকার চিহ্নও রয়েছে।
সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করতে গেলে স্কুলটির অফিস সহকারী আব্দুর আলিম বলেন, মাঠে আমদের দুইটা সিসি টিভি ক্যামেরা রয়েছে। ঘটনাটি স্পষ্ট আসতো ক্যামেরাই। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে ১ টা কি দেড়টার ভেতর। তখন বিদ্যুৎ ছিলো না। আর বিদ্যুতের জন্য বসে না থেকে স্যাররা মেয়েদের ক্রিকেট খেলা শুরু করে তখনই এই ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ না থাকায় সেই সময় ঘটনার কোনো ছবি বা ভিডিও পাওয়া যায়নি।
কথা হয়েছে জিতুর সহপাঠিদের সাথে। তারা নাম প্রকাশ না করার সর্তে বলেছেন, আমরা জিতুর বিভাগেই পড়ি। জিতু ভালো ছাত্র ছিলো না। জিতুর আচরনও অনেকটা অন্যরকম। মনে হয় যে কোনো সময় যে কাউকে মারধর করবে। তার খুব প্রভাব ছিলো, কোনো ছাত্র যদি তার কথা না শুনতো নানা শাস্তি দিতো। উৎপল স্যার এগুলো দেখে তাকে ধরে পিন্সিপালের কাছে অনেকবার নিয়ে গেছে।
স্কুলে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার জের টেনে এক ছাত্র বলেন, আমাদের কিছুদিন আগে ফুটবল খেলা হয়েছে। সেখানে জোর করে জিতু অধিনায়ক হয়েছে। সেই খেলায় জিতু জোর জবস্তি করে আমাদের কেই গোল দিয়েছে। আমরা কয়েকজন এটা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাকেসহ আমার আরেক বন্ধুকে মারধর করেছে।
স্থানয়ীরা জানিয়েছেন, জিতু আসলে অনেকটাই বে-পরোয়া। তার সাথে স্কুলের ছেলেদের চেয়ে বাইরের ছেলেদের উঠা বসা বেশি ছিলো। অনেক রাত পর্যন্ত সে বাইরে থাকতো। তার নেতৃত্বে একটি গ্রুপ চলতো। সবার বসয় প্রায় ১৭-১৮ এর ভেতর। কিশোর গ্যাং এর লিডারের মতই জিতুর চলা ফেরা ছিলো। জিতুতে সবাই জিতু দাদা বলেই চিনে। তার ফেসবুকেও জিতু দাদা নাম রয়েছে।
নাম প্রকাশে এক শিক্ষক বলেন, স্কুলটির পরিচালক মো: সুমন, তিনি জিতুর বাবা উজ্জ্বল হাজীর মামাতো ভাই। সেই ক্ষমতাই জিতুর উপর কেউ কথা বলতে পারে না। জিতু নানা অপর্কম করে বেরায়। জিতুকে নিয়ে অনেকবার বসা হলেও অজানা কারণে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি শিক্ষকরা।
বিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের স্কুল ও কলেজে ৫৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকা রয়েছে। উৎপল স্যার আমাদের এখানে ২০১৩ সাল থেকে চাকরি করেন। স্যার আমাদের এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব পালনে করেন। ঘটনার সময় আমি ছিলাম না। তবে শুনে দ্রুত স্কুলে এসে এই দুই দিন যাবৎ উৎপল স্যারের সাথে হাসপাতালেই ছিলাম। স্যারে অপারেশনে ৩০ ব্যাগের মত রক্ত লেগেছে তবুও স্যারকে বাচানো সম্ভব হয়নি। যে ছেলেটা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে সে একদমই ভালো ছেলে না। উৎপল স্যারই অনেক সময় আমার কাছে জিতুকে ধরে আনতো আমিসহ বাকি স্যাররা বিচার করতাম। এসব নিয়ে জিতুর অভিভাবককেও অনেকবার বলেছি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
জিতুর এই ঘটনায় বিদ্যালয় থেকে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দুই দিন যাবৎ হাসপাতালেই ছিলাম। প্রাথমিকভাবে জিতুকে বহিস্কার করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের পাশাপাশি আমরা স্কুল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবো। এখন পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রয়েছে।
উৎতপল কুমার সরকার হত্যাকান্ডের ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন তারা