চার বছরের হোসাইন। তার বয়স যখন দুই বছর, তখন মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। প্রথমে হোসাইনকে তার মা সঙ্গে নিয়ে গেলেও কিছুদিন পর বাবা সোহেল জোরপূর্বক হোসাইনকে তার মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসে। এরপর থেকে দুর্ভাগ্য যেন হোসাইনের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। মাদকাসক্ত সোহেল নিজের শিশু সন্তানের ন্যূনতম কোনো খেয়াল তো রাখতই না, বরং সারা দিন একা একটি ছোট্ট রুমে তালাবদ্ধ করে রেখে যেত। ভয়ডরকে সঙ্গী করে একাকী বেড়ে উঠতে থাকে হোসাইন। সারা দিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকলেও খোঁজ নেওয়ার কেউ ছিল না। মল-মূত্র ত্যাগ করলেও পরিষ্কার করে দেওয়ার কেউ ছিল না। উলটো বাসায় ফিরে ক্ষুধায় কাতর ছেলেকে কাঁদতে দেখলে উলটো তার ওপর চলত নির্মম নির্যাতন।
এমনই এক পরিস্থিতি থেকে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে তারই এক প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানাপুলিশের সহযোগিতায় তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে হোসাইনকে উদ্ধার করা হয়।
রাত দশটার দিকে ফতুল্লা মডেল থানার কাশীপুর শান্তিনগর কদম আলী স্কুলের পাশে সোহেলের বাসা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। তবে ঐ সময় সোহেল বাসায় বা এলাকায় ছিল না। সোহেল কাশীপুর শান্তিনগরস্থ কদম আলী স্কুল সংলগ্ন এলাকার মৃত মোমেন আলীর ছেলে। শিশুটির বাবা সোহেল একজন মাদকাসক্ত ও বখাটে বলে স্থানীয়রা জানায়।
স্থানীয়রা জানায়, বাসা থেকে বের হলে শিশুটিকে ঘরে একা তালাবদ্ধ করে চলে যেত। দিনের অধিকাংশ সময়ই শিশুটি অনাহারে থাকত। কান্না করলে তার ওপর চালত অমানুষিক নির্যাতন। পেটানো হতো হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে। সেই নির্যাতনের চিহ্ন হোসাইনের শরীরে এখনো বিদ্যমান।
স্থানীয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী শাওন বলেন, উদ্ধার হওয়া শিশুটির বাড়ির পাশেই তার দোকান। দুই থেকে তিন মাস আগে তিনি জানতে পারেন যে, চার বছর বয়সি এক শিশুকে তার বাবা সারা দিন ঘরে একা রেখে তালাবদ্ধ করে বাড়ির বাইরে বের হন। পেটের ক্ষুধায় কান্না করলেও শিশুটিকে খাবার দেওয়ার কেউ ছিল না। কখনো কখনো ছেলেকে জুস বা চিপস কিনে দিত সোহেল। তবে অধিকাংশ সময়ই শিশুটিকে মারধর করা হতো। শিশুটির বাবা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তার হাত-পা বেঁধে তালাবদ্ধ করে ঘর থেকে বের হতো।
গত দুদিন আগে এক দোকানে শিশুটিকেসহ তার বাবাকে দেখতে পেয়ে স্থানীয় এক মহিলা বাচ্চার রুগ্ন অবস্থার কারণ জিগ্যেস করলে ঐ নারীকে মারধর করে সোহেল। এ ঘটনা জানার পর শাওন ভালো করে খোঁজ নিয়ে শিশুটির ওপর অমানুষিক নির্যাতনের বিষয়টি জানতে পারেন। পরবর্তীকালে তিনি অপরিচিতা নামের ঢাকার একটি সামাজিক সংস্থার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তারা তাকে স্থানীয় থানাকে অবগত করতে বলেন।
গত শনিবার বিকালে তিনি ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলামকে বিষয়টি অবগত করেন।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি শরিফুল ইসলাম জানান, শনিবার রাত দশটার দিকে স্থানীয়দের সহায়তায় ঘরের তালা ভেঙে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। প্রথমে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। শিশুটির শরীরে একাধিক স্থানে ক্ষত রয়েছে। রবিবার সকালে জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা এসে শিশুটিকে নিয়ে যায়।
জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী তাছলিমা আক্তার জানান, চিকিৎসা শেষে আদালতের নির্দেশে শিশুটির বয়স অনুযায়ী সরকারি ‘ছোট মনি নিবাসে’ শিশুটিকে রাখা হয়েছে। শিশুটি বর্তমানে খুবই অসুস্থ। পুষ্টিহীনতা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ায় শিশুটি বেশ রুগ্ন হয়ে পড়েছে। ফলে তার চিকিৎসাটা খুবই জরুরি।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাসলিমা নাসরিন বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেন। পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। শিশুটি বর্তমানে জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের হেফাজতে রয়েছে
সূত্র: ইত্তেফাক