ঈদকে সামনে রেখে সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় অপরাধীচক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েকদিনে সাভার ও আশুলিয়ায় একাধিক ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
ঈদ আসলেই সাধারণত অপরাধীচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে, তবে এবার সাভার-আশুলিয়া এলাকায় এর মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে, ঈদকে সামনে রেখে ডাকাত-ছিনতাইকারীসহ মৌসুমি অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
সাভারে চলন্ত বাসে ডাকাতি: শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সাভারের পুলিশ টাউন এলাকায় যাত্রীবাহী শুভযাত্রা পরিবহনের একটি বাসে ছিনতাই এর ঘটনা ঘটে। দুইজন ছিনতাইকারী বাসে উঠে যাত্রীদের মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় এবং নারী যাত্রীদের চেইন ছিনিয়ে নেয়। যাত্রীরা বাধা দিলে ছিনতাইকারীরা ধারালো ছুরি দিয়ে তিনজনকে আহত করে পালিয়ে যায়।
একই স্থানে দিনে-দুপুরে চলন্ত বাসে ডাকাতি: রবিবার (২ মার্চ) দুপুর ২টার দিকে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একই স্থানে আবারও দিনদুপুরে বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের পুলিশ টাউন এলাকায় রাজধানী পরিবহনের একটি বাসে ৫-৬ জনের একটি ডাকাত দল অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয় এবং দ্রুত বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়।
ফের তিন সপ্তাহের ব্যবধানে চলন্ত বাসে ডাকাতি: সোমবার (২৪ মার্চ) রাত সাড়ে ৭টার দিকে শুভযাত্রা পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা আরিচাগামী শুভযাত্রা পরিবহনের একটি বাস সাভারের রেডিও কলোনী এলাকায় পৌছালে কয়েকজন ডাকাত যাত্রীভেসে বাসটিতে উঠেন। বাসটি একটু এগিয়ে সিএন্ডবি এলাকায় পৌছলে পরিবহনে থাকা যাত্রীদেরকে চাকুসহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বেশকিছু মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায়।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে হত্যা করে ডাকাতি: রোববার (৯ মার্চ) রাত সাড়ে ৮ টার দিকে আশুলিয়ার নয়ারহাট বাজারে দিলীপ জুয়েলার্স নামক স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা দোকানের মালিক দিলীপ কুমার দাসকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে এবং প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ডাকাতরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।
আশুলিয়ায় বন্ধ কারখানায় ডাকাতি: শনিবার (১ মার্চ) ভোর ৪টার দিকে আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার ম্যাগপাই কম্পোজিট লিমিটেড কারখানায় এই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে কারখানার ২টি কম্পিউটার, আইপিএসের ব্যাটারি, পরিত্যক্ত এয়ার কন্ডিশনার, বৈদ্যুতিক মোটর ও জেনারেটরের তারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে। এ সময় পাশের একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানেও ডাকাতি হয়।
অভিনেতা আজাদের বাড়িতে ডাকাতি: রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে ঢাকার আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় ছোট পর্দার অভিনেতা আজিজুর রহমান আজাদের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় দুর্বৃত্তরা তার পায়ে তিনটি গুলি করে এবং সেই সাথে তার মা ও স্ত্রী আহত হন।
এক রাতে তিন সড়কে ডাকাতি: শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) সাভার ও আশুলিয়ায় এক রাতেই তিনটি পৃথক সড়কে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের রেডিও কলোনিতে চলন্ত বাসে রাত ৮টার দিকে ওয়েলকাম পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে একদল ডাকাত ডাকাতি করতে ওঠে। এ সময় তারা চারজনকে কুপিয়ে আহত করে এবং যাত্রীদের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন লুট করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোশাররফ হোসেন হল সংলগ্ন মহাসড়কে নেমে যায়।
অপরদিকে শুক্রবার রাতেই আশুলিয়ার বঙ্গবন্ধু সড়কে গাছ ফেলে একটি বিয়ের বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মারধর করে নগদ টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া একইদিন রাত ১০টার দিকে আশুলিয়ার কাঠগড়া-টঙ্গাবাড়ি শাখা সড়কের দুর্গাপুর এলাকার ফোর স্পার্ক পোশাক কারখানা সংলগ্ন এলাকায় একটি প্রাইভেটকার থামিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
সাতজন নারীকে জিম্মি করে ডাকাতি: মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকায় একটি বাড়িতে ডাকাতরা প্রবেশ করে তিন পরিবারের সাতজন নারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। তাদের হাত, পা ও মুখ বেঁধে প্রায় ২৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। ভুক্তভোগীরা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও সময়মতো পুলিশি সেবা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক আয়শা আক্তার বর্ণা বলেন, রমজান মাসে আমাদের অফিস সকাল ছয়টা থেকে দেওয়ায় আমাদের ভোর পাঁচটার আগেই বাসা থেকে বের হতে হয়। রাস্তাঘাট তখন ফাঁকা থাকে, অনেক ভয় কাজ করে কারণ কিছুদিন পরপরই শুনি ডাকাতি ছিনতাই এর ঘটনা। প্রতিদিন রাতের শিফট শেষে বাসায় ফেরার সময়ও ভয় কাজ করে। ডাকাতি আর ছিনতাই বেড়ে গেছে, বিশেষ করে ফ্যাক্টরির কাছাকাছি এলাকায় পুলিশি টহল আরো বাড়ানো দরকার।
আশুলিয়ায় রেন্ট এ কার চালক আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা রাত-বিরাতে আমরা রাস্তায় বের হই। এখন রাস্তায় ডাকাতি এত বেড়েছে যে, মাঝরাতে কোথাও গাড়ি থামাতে সাহস হয় না। মাঝেমধ্যেই শুনছি গাড়ি থামিয়ে সবকিছু নিয়ে যাচ্ছে ডাকাতরা।
নয়ারহাট বাজারের মুদি দোকান মালিক দুলাল বলেন, এলাকায় এখন ব্যবসা করা কঠিন হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। দিলীপ জুয়েলার্সের ঘটনা আমাদের আরও আতঙ্কিত করেছে। প্রশাসন যদি কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ব্যবসা চালানোই কঠিন হয়ে যাবে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহীনূর কবির জানান, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ লাইন থেকে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সেই সাথে রাতের বেলায় মোবাইল টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন নিরাপদে চলাচল করতে পারে, সে লক্ষ্যে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি।